লাইলাতুল কদর এবং ইহার তাৎপর্যঃআক্তার হোসেন কাবুল


‘লাইলাতুন’ শব্দের আভিধানিক অর্থ রাত এবং ‘কদর’ শব্দের অর্থ সম্মান ও মাহাত্ম্য। ‘লাইলাতুল কদর’ অর্থ সম্মানিত বা মহিমানি¦ত রাত। ‘কদর’ শব্দের আর এক অর্থ ‘তকদীর’। কদর রজনীতে পরবর্তী এক বছরের নির্ধারিত বিধিলিপি ফেরেশতাদের হাতে হস্তান্তর করা হয়। সেই বিধিলিপিতে প্রত্যেক মানুষের জন্ম, বয়স, মৃত্যু, রিযিক ইত্যাদি লিপিবদ্ধ থাকে। উল্লিখিত বিধান প্রয়োগের জন্য চারজন ফেরেশতা নিয়োজিত থাকেন। তাহারা হইলেন হযরত ইসরাফীল (আঃ), হযরত মীকাঈল (আঃ), হযরত আযরাইল (আঃ) ও হযরত জিব্রাইল (আঃ)। এখানে উল্লেখ্য, লাইলাতুল বরাতেও তকদীর (পরবর্তী এক বছরের) লিপিবদ্ধ হয়; আবার লাইলাতুল কদরেও লিপিবদ্ধ হয়-দুই এর মধ্যে তফাৎ কি? মূলতঃ তকদীর সংক্রান্ত বিষয়াদির প্রাথমিক ফায়সালা হয় লাইলাতুল বরাতে এবং আল্লাহপাক তাহা নিজের কাছে সংরক্ষিত রাখেন। তকদীরের বিশদ বিবরণ লিপিবদ্ধ হয় লাইলাতুল কদরে যাহা এই রাত্রিতে ফেরেশতাদের নিকট সোপর্দ করা হয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ছাহেব বলেন, ‘আল্লাহতায়ালা সারা বছরের তকদীর সংক্রান্ত ফায়সালা শবে বরাতে সম্পন্ন করেন, অতঃপর শবে কদরে এইসব ফায়সালা সংশ্লিষ্ট ফেরেশতাদের নিকট সোপর্দ করেন।” (মাযহারী)
লাইলাতুল কদরের মাহাত্ম্য ও ফযিলত সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা বলেন, “আমি ইহাকে (কুরআন শরীফ) নাযিল করিয়াছি লাইলাতুল কদরে। লাইলাতুল কদর সম্বন্ধে আপনি কি জানেন? লাইলাতুল কদর হইল এক হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। এই রাত্রিতে প্রত্যেক কাজের জন্য ফেরেশতাগণ ও রূহ অবতীর্ণ হয় তাহাদের পালন কর্তার নির্দেশে। এটা নিরাপত্তা, যাহা ফজর পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। (সূরা কদরঃ ১-৫)
আল্লাহপাক অন্যত্র আরও বলেন, “আমি ইহা [কুরআন মজীদ] এক কল্যাণপূর্ণ রজনীতে অবতীর্ণ করিয়াছি।” (সূরা দুখানঃ ৩)
সূরা কদরের প্রথম আয়াতে দেখা যায় যে, পবিত্র কুরআন মজীদ শবে কদরে নাযিল হইয়াছে এবং সূরা দুখানের উল্লিখিত আয়াতে কুরআন অবতীর্ণের রজনী কল্যাণপূর্ণ রাত বলিয়া আখ্যায়িত হইয়াছে। ইহাতে সহজেই বুঝা যায় যে, শবে কদরের শ্রেষ্ঠত্বের মূলে আছে পাক কুরআনের শ্রেষ্ঠত্ব। কুরআন শরীফ নাযিলের মাধ্যমে আল্লাহপাক উক্ত রজনীকে মহিমানি¦ত করিয়াছেন।
কুরআন মজীদ আল্লাহর কালাম। ইহা মানব জাতির মুক্তির সনদ। পাক কুরআন বিশ্ব মানবের পথপ্রদর্শক। শান্তির বাণীবাহক। কুরআন মজীদে আছে সর্ববিধ সমস্যার সমাধান। আছে ব্যক্তি সমস্যার সমাধান; আছে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রিয় সমস্যার সমাধান। তেমনি ইহাতে আছে আধ্যাত্মিক সমস্যার সমাধান। কুরআন শরীফ শরীয়ত, তরিকত, হকিকত ও মারেফাতের সূক্ষ্ম তথ্যাবলীতে পূর্ণ।
কালামুল্লাহ শরীফের তিনটি অবস্থা আছে। যথাঃ
* পাক কালামের হকিকতগত অবস্থা,
* লওহে মাহফুজস্থিত অবস্থা এবং
* প্রকাশ্য অবস্থা।
কুরআন মজীদের উৎপত্তিস্থল সিফাতে হাকীকীর অন্যতম সিফাত-সিফাতে কালাম। সিফাতে কালাম হইতে উৎপন্ন কালামুল্লাহ শরীফের অবর্ণনীয় ও অবোধগম্য অবস্থাই হকিকতে কুরআন। সেই উচ্চ মাকামে আল্লাহর কালাম আরম্ভ ও শেষ বিমুক্ত, ভাষা ও অক্ষরবিহীন অবস্থায় বর্তমান। হকিকতে কুরআনের মাকাম হইতে ভাষাবিহীন অবস্থায় শবে কদরের রজনীতেই আল্লাহর কালাম অবতরণ করিতে করিতে স্থূলজগতের অন্তর্ভুক্ত মানিক্য সদৃশ ফলক ‘লওহে মাহফুজে’ ভাষার আকৃতিতে স্থিত হয়। একই রজনীতে আল্লাহর নির্দেশে হযরত জিব্রাইল (আঃ) লওহে মাহফুজস্থিত আয়াতপাক সমূহ রাসূলে করীম (সাঃ) এর নিকট লইয়া আসেন। তাই শবে কদরকে বলা হয় কুরআন অবতরণ-রজনী। প্রতি বৎসর লাইলাতুল কদর উৎযাপনের মৌলিক উদ্দেশ্যই হইল কুরআন মজীদের জন্ম বার্ষিকী পালন কিংবা পাক কালামের অবতরণ-রজনী উৎযাপন। কালামুল্লাহ শরীফের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার কারণেই শবে কদরের এত কদর বা আদর।
হযরত শাহ আবদুল হক দেহলবী (রঃ) ছাহেব এই প্রসংগে বলেন- “রমজানুল মোবারক মাস এই উম্মতের জন্য বিশেষ দয়ার মাস। আল্লাহতায়ালা এই উম্মতের জন্য সীমাহীন দয়া ও রহমত করিয়াছেন ও করিতেছেন। তাহার দান অফুরন্ত ও অসংখ্য, উহা গণনা করা কাহারও পক্ষে সম্ভব নহে। আমাদের আত্মা, আমাদের জীবন, আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের চক্ষু, নাসিকা, কর্ণ, হস্ত, পদ, মন, মগজ সবকিছুই আল্লাহর নেয়ামত-যদ্বারা আমরা উপকৃত। মাটি, বাতাস, পানি, শস্যকণা, ফল, ফুল-যাহা কিছু আমাদের প্রয়োজন ছিল সবকিছু আল্লাহ মাটির দস্তরখানে আমাদের জন্য বিছাইয়া দিয়াছেন। আবার বিশেষভাবে মানুষকে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বানাইয়াছেন, তাহাদিগকে খলিফা বানাইয়াছেন, সমগ্র সৃষ্টির উপর প্রাধান্য দান করিয়াছেন, যাহাতে তাহারা উহা উপভোগ করিতে পারে। ইহা বিশেষ দান-কিন্তু সর্বাপেক্ষা বড় নেয়ামত হইল আল্লাহর সহিত কথোপকথন ও তাঁহার কালামের উদ্দেশ্য হওয়া। মানুষের জন্য আল্লাহর সর্ববৃহৎ দান এই যে, আল্লাহ মানুষকে তাহার সহিত কথোপকথনের মর্যাদা দান করিয়াছেন, তাহাদের উদ্দেশ্যে কালাম করিয়াছেন, তাহাদিগকে তাঁহার কালাম নাযিলের যোগ্য করিয়াছেন, উহা বুঝা ও বুঝানো ও উহার তেলাওয়াতের সুযোগ দান করিয়াছেন। তাহার প্রতিটি নেয়ামতই সীমাহীন; কিন্তু এই নেয়ামত যে, আল্লাহতায়ালা মহান নবী করীম (সাঃ) কে প্রেরণ করিয়া তাহার মাধ্যমে আমাদিগকে তাঁহার সহিত আলাপের মর্যাদা দান করিয়াছেন, আমাদের নিকট কুরআন মজীদ পাঠাইয়াছেন এবং আমাদিগকে এতটুকু যোগ্যতা দান করিয়াছেন যাহাতে আমরা উহা তেলাওয়াত করিতে পারি, উহা শ্রবণ করিতে পারি, উহা বুঝিতে পারি, উহার উপর আমল করিতে পারি এবং উহার উপর চিন্তাভাবনা করিতে পারি। ইহা আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত। ইহার কোন তুলনা নাই। কুরআন মজীদ হইল আল্লাহর কালামে নাফসী। আল্লাহর জাত ও সিফাতের ভার বহন ও উহা বুঝা আমাদের মস্তিস্কের ক্ষমতা বহির্ভূত ব্যাপার। আল্লাহ তাহার কালামে নাফসীকে এই কালামে লফজী [শাব্দিক কথন]-তে রূপান্তরিত করিয়া উহাকে সহজ করিয়া দিয়াছেন। আল্লাহপাক তাই বলেন, “আমরা অতঃপর উহা বুঝা ও নসিহত গ্রহণ করার জন্য উহাকে সহজ করিয়া দিয়াছি।”…………..
“হযরত আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী (রঃ) বলেন, কুরআন মজীদ তেলাওয়াতের ন্যায় নেয়ামত ফেরেশতাগণও পান নাই। এই জন্য হাদীসে উল্লেখ রহিয়াছে যে, ফেরেশতাগণ জামাতে নামাযে শরীক হন যাহাতে কুরআন তেলাওয়াত শ্রবণ করিতে পারেন। সূরা ফাতেহা শেষ হইলে ‘আমীন’ বলেন। যেখানে কুরআন মজীদ পাঠ করা হয় সেখানে ফেরেশতাগণ জমায়েত হইয়া আরশ পর্যন্ত নীচ হইতে উপরে পাখা ছড়াইয়া দেন, আশেপাশে ঘেরাও করিয়া রাখেন যাহাতে পাক কুরআন-এর অছিলায় যে রহমত নাযিল হয় তাহাতে ফেরেশতাগণও ভাগী হইতে পারেন ও উহা শ্রবণ করিতে পারেন। শাহ ছাহেব আরও বলেন, কুরআন শরীফ তেলাওয়াতের ফযিলত ও মর্যাদা কেবলমাত্র এই উম্মতই লাভ করিয়াছে। পূর্ববর্তী উম্মতকেও আল্লাহতায়ালা আহকাম দান করিয়াছেন, তাহাদিগকে কিতাব দান করিয়াছেন- কিন্তু কালাম দান করেন নাই। যেমন হযরত মূসা (আঃ)-কে তওরাত শরীফ দান করিয়াছেন। উহা লিপিবদ্ধ জিনিস ছিল, উহা কালাম বলা যায় না। কিতাব ভিন্ন জিনিস এবং কালাম ভিন্ন জিনিস। কালাম মুতাকাল্লিম [কালামকর্তা] উচ্চারণ করে ও উহাতে আওয়াজের সৃষ্টি হয়। কাহাকেও নিজের কুশলাদি লিখিয়া জানাইলে উহাকে কিতাব বলা যাইবে, আর যদি টেলিফোনে কথাবার্তা বলা হয় বা সামনা-সামনি সে কর্ণে শ্রবণ করে, উহাকে বলা হয় কালাম। কুরআন মজীদ হইল আল্লাহর কালাম। উহার শব্দ ও অর্থ-উভয়ই আল্লাহর পক্ষ হইতে আসিয়াছে। আল্লাহতায়ালা উহাকে আমাদের জন্য নিজে বুঝা ও অন্যকে বুঝাইবার মাধ্যম করিয়া দিয়াছেন ও উহার তেলাওয়াত আমাদের জন্য সহজ করিয়া দিয়াছেন।”
উপরের আলোচনা হইতে কুরআন মজীদের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে উপলব্ধি করা যায়। এই মহান কুরআন মজীদ নাযিল শুরু হয় লাইলাতুল কদরে। তাই-ই লাইলাতুল কদরের ইবাদতের এত গুরুত্ব।
সূরা কদরের অপর এক আয়াতে আল্লাহপাক বলেন, “লাইলাতুল কদর হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।” ইহার অন্তর্নিহিত রহস্য কি?
উল্লিখিত শ্রেষ্ঠত্বের গূঢ় রহস্য জানার জন্য সূরা কদরের শানে নুযুল সম্পর্কীয় আলোচনা প্রয়োজন। সূরা কদরের শানে নুজুল হইতে জানা যায় যে, একদা দয়াল নবী (সাঃ) বণী ইসরাঈলের একজন প্রখ্যাত মোজাহিদ সম্পর্কে আলোচনা করিলেন। উক্ত মোজাহিদ একাধারে এক হাজার মাস ব্যাপী ধর্মদ্রোহী দুশমনদের সাথে জেহাদ করিয়াছেন। ইহা শ্রবনে উপস্থিত সাহাবা সকল বিস্মিত হন এবং নিজেদের অল্পায়ুর কথা চিন্তা করিয়া দুঃখিতও হন। তখন উম্মতপ্রেমিক দয়াল নবী (সাঃ) খোদাতায়ালার নিকট এই দু’আ করেন, “হে আল্লাহ! আমার উম্মতদের আয়ু খুব কম এবং তাহাদের আমলও অল্প; আপনি দয়া করিয়া তাহাদের নেকী বাড়াইয়া দেন।” এই পরিপ্রেক্ষিতে সূরা কদর নাযিল হয়। আল্লাহতায়ালা উম্মতে মোহাম্মদীর জন্য মহিমানি¦ত রাত-লাইলাতুল কদর দান করেন, যে রাত্রের ইবাদত হাজার মাসের জেহাদের পুণ্যের চেয়েও বেশী।
কথিত আছে, বণী ইসরাঈল বংশের যে মোজাহিদ সম্পর্কে দয়াল নবী (সাঃ) আলাপ করিতেছিলেন তিনি একজন নবী ছিলেন। তাহার নাম ছিল শামউন। তিনি যেমন অসম সাহসী ছিলেন, তেমনি বলবান ছিলেন। তাঁহার শৌর্য, বীর্য, শক্তি, সাহসিকতা, বুদ্ধি ও কৌশলের নিকট ধর্মদ্রোহী কাফেরদের কোন কৌশল ও শক্তিই টিকিত না। হাজার মাস যাবৎ শত্রুপক্ষ হযরত শামউন নবী (আঃ) এর নিকট পুনঃ পুনঃ পরাজিত হইয়া আসিতেছিল। শেষ পর্যন্ত কাফেররা তাঁহাকে পরাস্ত করিতে এক হীন কৌশল আটিল। তাহারা নবী (আঃ) এর স্ত্রীর সাথে আঁতাত করিল। তাহাকে স্বর্ণের লোভ দেখাইল। কাফেররা গোপনে নবী (আঃ) এর উক্ত স্ত্রীকে বলিল, আপনি যদি ঘুমন্ত অবস্থায় শামউনকে মোটা রশি দ্বারা বাঁধিয়া আমাদের হাতে সোপর্দ করিতে পারেন, তবে আপনাকে প্রচুর পরিমান স্বর্ণ দেওয়া হইবে। প্রলুব্ধা নারী একদা নিশীথে ঘুমন্ত শামউনকে মোটা ও মজবুত রশি দিয়া বাঁধিয়া ফেলিল। কিন্তু জাগ্রত হইয়া শামউন একটু নড়াচড়া দিতেই তথাকথিত মজবুত রশি পট্‌পট্ শব্দে ছিড়িয়া গেল। কারণ জিজ্ঞাসা করায় স্ত্রী বলিল, “আমি আপনার শক্তি পরীক্ষা করিয়াছি মাত্র।” যথাসময়ে গুপ্তপথে কাফেরদের নিকট এই সংবাদ পৌঁছাইল। তাহারা পুনরায় একটি মজবুত লৌহ জিঞ্জির শামউনের স্ত্রীর নিকট পাঠাইয়া দিল। কিন্তু এই বারও কাফেরদের চেষ্টা ব্যর্থ হইল। আল্লাহ প্রদত্ত শক্তির নিকট কাফেরদের শক্ত রশি বা জিঞ্জির কিছুই কার্যকরী হইল না। ইত্যাবসরে অভিশপ্ত ইবলিস মানবরূপে কাফেরদের নিকট উপস্থিত হইয়া তাহাদেরকে পরামর্শ দিল। শয়তান বলিল, তোমরা শামউনের স্ত্রীকে বল-সে যেন সরাসরি তাহার স্বামীকে জিজ্ঞাসা করে-এমন কি জিনিস আছে, যাহার নিকট তাঁহার শারীরিক শক্তি অকার্যকর হইবে? দুশমনেরা তাহাই করিল। একদা এক নিশীথে সেই দুষ্ট নারী স্বামীকে জিজ্ঞাসা করিল, “আচ্ছা! বৎসরের পর বৎসর যাবৎ দেখিতেছি যে, দুশমনদের কোন কৌশলই আপনার নিকট টিকে না। আপনার অভূতপূর্ব শারীরিক শক্তি দেখিয়া সকলেই ভীত সন্ত্রস্ত। এমন কোন কৌশল কি নাই যাহার নিকট আপনি দুর্বল হইবেন?” ছলনাময়ী নারীর ছলনা শামউন বুঝিতে পারিলেন না। আল্লাহ প্রদত্ত শক্তির নিগুঢ় রহস্য তিনি স্ত্রীর নিকট প্রকাশ করিয়া ফেলিলেন। তিনি বলিলেন, “আমাকে রশি দিয়াই বাঁধা হউক, আর জিঞ্জিরই পরানো হউক, আমার শক্তির নিকট মজবুত কোন কিছুই মজবুত নহে। তবে আমার মাথার লম্বা চুল দ্বারা যদি কেহ আমাকে বাঁধিয়া ফেলিতে পারে, তখনই কেবল আমার শক্তি লোপ পাইবে। এখানে উল্লেখ্য যে, শামউন নবী (আঃ) এর মাথায় আট গুচ্ছ লম্বা চুল ছিল। ইহা এত অধিক লম্বা ছিল যে, তিনি দন্ডায়মান হইলে তাহার চুলের নিম্নাংশ যমীন স্পর্শ করিত।
একদা গভীর রাত। শামউন নবী নিদ্রাভিভূত। সুচতুরা নারী গোপনে চুলগুচ্ছ কাটিয়া শামউন নবী (আঃ) এর হাত পা বাঁধিয়া ফেলিল। জাগ্রত হইয়া তিনি আর তাহা ছিন্ন করিতে পারিলেন না। ইত্যাবসরে দুশমনেরা সংবাদ পাইয়া দলে দলে শামউন নবী (আঃ) এর গৃহে প্রবেশ করিয়া তাহাকে চুল-বন্ধী অবস্থায় বন্দী করিয়া এক বধ্যভূমিতে লইয়া গেল। সেখানে দুশমনেরা তাঁহাকে ধারালো অস্ত্রের সাহায্যে বহু খন্ডে বিভক্ত করিয়া উল্লাস করিতে করিতে চলিয়া গেল। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ছিল অন্যরূপ। তিনি জিব্রাইল ফেরেশতাকে বলিয়া পাঠাইলেন, “হে জিব্রাইল! তুমি যাও, শামউনের দেহের বিভিন্ন খন্ডকে একত্রিত কর।” ফেরেশতা তাহাই করিলেন। অতঃপর আল্লাহর কুদরতী ক্ষমতায় শামউন নবী পুনরায় জীবিত হইলেন। আল্লাহপাক পূর্বাপেক্ষা সত্তর (৭০) গুণ শক্তি তাহাকে দান করিলেন। নূতন জীবন পাইয়া প্রথমেই তিনি আপন গৃহের শত্রু বেঈমান স্ত্রীকে হত্যার জন্য উদ্যত হইলেন। তৎক্ষণাৎ ওহীর মাধ্যমে আল্লাহতায়ালা তাঁহাকে বলিলেন, “হে শামউন! মশা মারিয়া হাত ময়লা করিও না।” অতঃপর শামউন বীরবিক্রমে পূর্বাপেক্ষা ৭০ গুণ শক্তিতে দুশমনদের উপর ঝাঁপাইয়া পড়িলেন এবং তাহাদেরকে সমূলে ধ্বংস করিলেন।
উল্লিখিত শামউন নবীই(আঃ) এক হাজার মাস একাধারে ধর্মদ্রোহীদের সাথে জেহাদ করিয়াছিলেন। এক হাজার মাসের জেহাদে তাহার যে নেকী হইয়াছিল, তাহার চেয়েও অধিক নেকী লইয়া উম্মতে মোহাম্মদীর জন্য প্রতি বছর উপস্থিত হয় লাইলাতুল কদর বা মহিমানি¦ত রাত।
লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব ও তাৎপর্য সম্পর্কে ইমাম আবু মুহাম্মদ ইবনে আবু হাতিম (রঃ) হযরত কাব আহরার (রঃ) হইতে একটি বিস্ময়কর বর্ণনার উল্লেখ করিয়াছেন। তাহা হইলঃ
সপ্তম আকাশে জান্নাতের নিকটতম স্থানে সিদরাতুল মুনতাহা অবস্থিত। উক্ত গাছের প্রতিটি শাখা-প্রশাখায় অসংখ্য ফেরেশতা। এক চুল পরিমানও খালি নাই। ঐ গাছের মাঝামাঝি স্থানে হযরত জিব্রাইল (আঃ) এর আবাস। মোমেন বান্দাগণের প্রতি অতিশয় স্নেহশীল ও মমতার প্রতীক এই সব ফেরেশতাকে নিয়া শবে কদরে ভূপৃষ্ঠে পদার্পণ করিবার জন্য মহান আল্লাহ হযরত জিব্রাইল (আঃ) কে নির্দেশ দেন। সব ফেরেশতা জিব্রাইল (আঃ) এর নেতৃত্বে পৃথিবীতে আগমন করেন এবং দুনিয়ার সর্বত্র ছড়াইয়া পড়েন। প্রত্যেক স্থানে সেজদা ও রুকু করেন। মোমেন নারী-পুরুষদের জন্য দু’আয় লিপ্ত হন। কিন্তু গির্যা, মন্দির, প্রতিমা ও অগ্নিপূজার স্থান, আবর্জনার স্তুপ, যে গৃহে নেশাখোর, বাদ্যযন্ত্র ও পুতুল প্রতিমা থাকে সেইসব জায়গা হইতে তাঁহারা দূরে সরিয়া থাকেন। এইভাবে সারা রাত্রি তাঁহারা পৃথিবীর আনাচে-কানাচে ঘুরিয়া বেড়ান এবং মোমেনদের জন্য মঙ্গল কামনা ও কল্যাণের দু’আ করিতে থাকেন। হযরত জিব্রাইল (আঃ) প্রত্যেক ঈমানদারের সহিত করমর্দন করেন। শরীর রোমাঞ্চিত হওয়া, হৃদয় বিগলিত হওয়া, চোখের পানি গড়াইয়া পড়া ইত্যাদি তাহার করমর্দনের আলামত। এই অবস্থা অনুভূত হইলে বুঝিতে হইবে যে, এই মুহূর্তে আমার হাত জিব্রাইল (আঃ) এর হাতের ভিতর। হযরত কাব (রঃ) আরও বলিলেন, যে ব্যক্তি এই রাত্রিতে তিনবার ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পড়িবে, প্রথম পাঠ করার বদৌলতে তাহাকে ক্ষমা করা হইবে, দ্বিতীয়বার পড়ার জন্যে সে দোযখ হইতে নিস্কৃতি পাইবে, তৃতীয়বার উচ্চারণের ফলে সে জান্নাতে প্রবেশ করিবে। রাবী কর্তৃক তিনি জিজ্ঞাসিত হইলেন, হে আবু ইসহাক! যে ব্যক্তি এই কলেমাকে নিষ্ঠার সহিত বলিবে, কেবল তাহারই জন্য কি এই ফযিলত? তিনি বলিলেন, কেবল নিষ্ঠাবান সত্যবাদী ব্যক্তিই এই কলেমা পাঠ করিবে। আল্লাহর শপথ করিয়া বলিতেছি, পিঠে পাহাড় উঠাইয়া দিলে যেরূপ ভারী মনে হয়, মুনাফেক ও কাফেরের পক্ষে শবে কদর সেই রূপ ভারী মনে হইবে। ফজর পর্যন্ত ফেরেশতারা এই রূপে অবস্থান করেন। অতঃপর আসমানে প্রথম আরোহণ করেন হযরত জিব্রাইল (আঃ)। তিনি অনেক উপরে উঠিয়া নিজের পাখাগুলি বিশেষতঃ সবুজ দুইটি পাখা মেলিয়া ধরেন। সাধারণতঃ এই দুইটি পাখা রাত্রি ব্যতীত কখনও মেলেন না। এই দুইটি ডানা মেলার কারণেই শবে কদরের ভোরে যখন সূর্যোদয় হয়, তখন উহার আলোক রশ্মি দেখা যায় না, বরং একটি চৌদ্দ তারিখের চন্দ্র বা স্বর্ণথালার ন্যায় উহাকে দেখায়। অতঃপর একজন একজন করিয়া সকল ফেরেশতা উপরে উঠেন। ফেরেশতাদের নূর হযরত জিব্রাইল (আঃ) এর নূরের সাথে একত্রিত হইয়া সূর্যের জ্যোতিকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলে। ফেরেশতাকুলের নূরানী সমাবেশ দেখিয়া সূর্যও কিছুক্ষণের জন্য অভিভূত থাকে। এই অগণিত ফেরেশতা সেই দিন আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী স্থানে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল মোমেনের জন্য দু’আ এবং ক্ষমা ভিক্ষা করিয়া সারা দিন অতিবাহিত করে। এই দু’আ তাহাদের জন্য যাহারা নিষ্ঠার সহিত সিয়াম পালন করিয়াছেন এবং আগামী বৎসর জীবিত থাকিলে রমযানের সিয়াম আরও উত্তমরূপে সম্পন্ন করিবেন বলিয়া নিয়ত করিয়াছেন। তাহারা সন্ধ্যা হইলে প্রথম আসমানে উঠেন এবং সেখানকার সমস্ত ফেরেশতা তাহাদের চতুর্পার্শ্বে ঘিরিয়া বসেন। দুনিয়াবাসী প্রত্যেক নারী-পুরুষ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করিতে থাকেন। জিব্রাইল (আঃ) এবং তাহার সহচরগণ এক একটি প্রশ্নের জবাব দান করেন। তাহারা এইরূপ প্রশ্নও করেন যে, এই বৎসর অমুক ব্যক্তিকে কেমন পাইয়াছেন? তখন তাহারা বলেন, গত বৎসর আমরা তাহাকে ইবাদতে রত অবস্থায় পাইয়াছিলাম, কিন্তু এই বৎসর আমরা তাহাকে পাপকার্যে লিপ্ত পাইয়াছি। অমুক ব্যক্তিকে আমরা গত বৎসর পাপে লিপ্ত পাইয়াছিলাম, কিন্তু এইবার আমরা তাহাকে ইবাদতে রত পাইয়াছি। তখন আসমানের ফেরেশতারা প্রথমোক্ত ব্যক্তির জন্য দু’আ বাদ দিয়া দ্বিতীয় ব্যক্তির জন্য দু’আ আরম্ভ করিয়া দেন। ফেরেশতাগণ তাহাদের নিকট আরও বিস্তারিত বিবরণ দেন। অমুককে সালাতে পাইয়াছি, অমুককে কুরআন তেলাওয়াতে পাইয়াছি, অমুককে দরুদ পাঠাবস্থায় পাইয়াছি ইত্যাদি ইত্যাদি।
প্রথম আসমানে একদিন একরাত কাটাইয়া তাহারা দ্বিতীয় আসমানে যান। সেখানেও প্রথম আসমানের ন্যায় প্রশ্ন করা হয় এবং মানুষের আমলের বিবরণ শুনান হয়। এইভাবে তাঁহারা সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত পৌঁছান। তখন সিদরাতুল মুনতাহা ফেরেশতাগণকে বলেনঃ দেখ, তোমাদের উপর আমার হক আছে। যাহাকে আল্লাহ ভালবাসেন, আমি তাহাদিগকে ভালবাসি। মানুষের অবস্থা আমার নিকটও একটু বর্ণনা করুন। হযরত কাব (রঃ) বলেন, তখন ফেরেশতাগণ প্রত্যেক মানুষের নাম তাহাদের পিতার নাম সহকারে সিদরাতুল মুনতাহার নিকট এক এক করিয়া বর্ণনা করেন। অনন্তর জান্নাত উক্ত বৃক্ষের নিকট আরয করে যে, তোমার নিকট অবস্থানকারী ফেরেশতারা যাহা কিছু বলিয়াছেন, উহা আমার নিকট ব্যক্ত কর। সিদরাতুল মুনতাহা সমস্ত কিছু জান্নাতকে অবহিত করে। জান্নাত তখন বলে, অমুক পুরুষের উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হউক, অমুক নারীর উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হউক। হে আল্লাহ! অতি সত্বর তাহাদিগকে আমার নিকট পৌঁছাইয়া দিন।
অতঃপর জিব্রাইল (আঃ) নিজের ঠিকানায় আগমন করিলে তাহার নিকট গায়েবী হুকুম প্রেরিত হয়। তিনি আল্লাহর নিকট বলেন, হে আল্লাহ! তোমার অমুক অমুক বান্দাকে সেজদারত পাইয়াছি। তুমি তাহাদিগকে ক্ষমা কর। আল্লাহ বলেন, আমি তাহাদিগকে ক্ষমা করিলাম। এই সংবাদ জিব্রাইল (আঃ) আরশের বাহক সকল ফেরেশতাকে শুনাইয়া দেন। তখন সকলেই বলিয়া উঠেন, অমুক অমুক বান্দার ওপর আল্লাহর দয়া হইয়াছে। তাহাদিগকে ক্ষমা করা হইয়াছে। অতঃপর জিব্রাইল (আঃ) আরয করেন, হে আল্লাহ! তোমার একজন বান্দাকে গত বছর সুন্নতের উপর পাইয়াছিলাম, কিন্তু এই বছর তাহাকে বিদ্আতে লিপ্ত পাইলাম। মহান আল্লাহ তখন বলেন, হে জিব্রাইল! সে যদি মৃত্যুর তিন ঘন্টা পূর্বেও তওবা করে, তবে তাহাকে ক্ষমা করিব। জিব্রাইল (আঃ) বলিয়া উঠেনঃ হে আল্লাহ! তুমি সকল প্রশংসার উপযুক্ত। এলাহী! তুমি সৃষ্টির উপর সবচেয়ে বেশী দয়ালু। বান্দার উপর তোমার দয়া তাহাদের আপন দয়া হইতেও অনেক বেশী। তখন আল্লাহর আরশ, আরশের পর্দা ও চতুর্দিকের সবকিছুই প্রকম্পিত করিয়া বলিয়া উঠে, আল হামদু লিল্লাহির রাহিম। আল হামদু লিল্লাহির রাহিম। (তাফসীরে ইবনে কাসীর)
উপরের আলোচনা থেকে কদর রাত্রির তাৎপর্য সম্পর্কে সহজেই ধারণা জন্মে। এই লাইলাতুল কদরের রাত্রি জাগরণ ও ইবাদতে অনেক আবেদের দেল পরিচ্ছন্ন হয় এবং দেলে খোদার নূর চমকায়। সেই নূরে আবেদ আপন কালবের আয়নায় ঊর্ধ্ব জগতের দৃশ্যাবলী তথা বেহেশত, দোযখ, আরশ, কুরছি, লওহ, কলম, আসমান, জমীন ইত্যাদি দেখিতে পায় যেমন টেলিভিশনের পর্দায় বিভিন্ন ছবি দেখা যায়। এই মহিমানি¦ত রাত্রিতে ইবাদতকারীর গোনাহখাতা ক্ষমা করিয়া দেওয়া হয়।(তথ্যসূত্রঃ নসিহত-সকল খন্ড একত্রে, পৃষ্টা নং ১১৮২-১১৮৭)


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

শিক্ষাঙ্গন

খেলাধুলা

লাইফস্টাইল

ঘোষনাঃ