একটি রাতের গল্প :জুলফিয়া ইসলাম

আকাশটা কেমন নত হয়ে গেল। পৃথিবীর খুব কাছাকাছি। বাতাসও বইছে না। বিশ্বব্রহ্মাÐে এক শূন্যতা যেন হাহাকার করছে।
দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। স্বামীর অপেক্ষা করছেন। অবিচল তাঁর স্বামী একটু দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে সিঁড়ি ভেঙে নিচে গেছেন। ব্যাপারটা কী? এতো গুলি চালাচ্ছে কারা? তিনি বুঝতে পারছেন ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি এসে পড়ছে তাঁর ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বর সড়কের ছয়শ সাতাত্তর নম্বর বাড়ির ওপরে।
বঙ্গবন্ধু নিচে গেছেন। ঘরের দরজায় তাঁর অপক্ষোয় কাঁদছেন রেণু। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন, কাঁদতেই থাকেন। কখনো গুলির শব্দ ছাপিয়ে কান্নার শব্দ প্রবল বেগ পাচ্ছে। তাঁর চোখের সামনে সিঁড়িটা দুলছে। দৃষ্টিতে প্রবল ঘূর্ণির মতো সেটা উড়ছে। কিছু একটা ধরার জন্য প্রবল চেষ্টা করছেন রেণু কিন্তু না হাত ফিরে আসছে বুকে। রেণুর কণ্ঠ শোনা যায় না। বুকের ভেতর শব্দরাজি গড়াগড়ি করে। এই বাড়ির একেকটি মুহূর্ত বিভীষিকাময়।
দরজায় দাঁড়িয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন রাসেল ঘুমিয়ে আছে। ছেলেটির ঘুমন্ত মুখটি কি পবিত্র। ঠিক যেন রূপালি চাঁদ। রাসেলের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকালেই মনে হয় বঙ্গবন্ধু বলছেন, তুমি তোমার অনেক কথাই আমার সঙ্গে বলতে পারনি। আমাকে গ্রেফতার করা হয়েছে কয়েকবারই। তবুও তোমার হাসিভরা মুখ আমি খুব কম দেখেছি, তা নয়। আমি এই বাংলার দুঃখী মানুষের সাথে মিশেছি। আমি সাধারণ মানুষের কাছে বারবার বলেছি, আমি বন্দুকের নলের ক্ষমতায় বিশ্বাস করি না। আমি মনে করি বাংলার উৎস বাংলার জনগণ। এটাই আমার রাজনীতির দর্শন। আমি এ দেশের সাত কোটি বাঙালির ভালোবাসার কাঙাল।
শব্দগুলো রেণুর বুকের পাটাতনে ধাক্কা দিচ্ছে। রেণু দরজায় দাঁড়িয়ে আবার একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখেন রাসেল ঘুমিয়ে আছে। এই ছোট্ট শিশুটির জন্যই রেণুর ভাবনা অনেক। এই বাড়িতেই ছেলেটির জন্ম। রেণুর মনে হচ্ছে কী এক অঘটন ঘটতে যাচ্ছে। এ জগতে বোধহয় তাঁরা আর থাকতে পারবেন না।
উপরে ওঠার জন্য সিঁড়িতে পা রাখলেন বঙ্গবন্ধু। হঠাৎ বিদ্যুতের ঝলকানি। এ রকমটি তো কখনও হয়নি। এ সিঁড়ি তাঁর অতি পরিচিত আপনজনের মতোই। সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতেই দেখলেন রেণু কাঁদছে। এ মহান নারী তাঁকে সারাজীবনই আশ্বাস দিয়ে গেছেন। তবে আজ কেন এতো ভীত সন্ত্রস্ত? ইতোমধ্যে রাসেলের ঘুম ভেঙে গেছে। এগিয়ে এসে জিগ্যেস করল, মা কি হয়েছে? আপনি কি আপুদের জন্য মন খারাপ করেছেন? রাসেলের কথায় চমকে গেলেন রেণু। তিনি রাসেলকে বুকে জড়িয়ে ধরে মনে মনে ভাবলেন এটাই তো আল্লাহর রহমত আজ যে মেয়ে দুটো বাড়িতে নেই।
বেগম ফজিলাতুন্নেছা রেণু তিনি বাড়ির ভেতরে ছুটাছুটি করছেন। বঙ্গবন্ধু শান্ত কণ্ঠে বললেন, হঠাৎ এমন ছুটাছুটি শুরু করলে কেন রেণু? শান্ত হও। তোমাকে বলছি, আমাকে কে হত্যা করবে? আমাকে হত্যার পর দেশের মানুষ কি ভালো থাকবে? আমি মরে গেলেও দুঃখ নেই। পৃথিবীর সব মানুষের মতো আমিও একদিন মরব। আমি তো ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বলেছিÑআমি বাঙালি, আমি মানুষ, আমি মুসলমান, মানুষ একবারই মরে, বারবার মরে না। বন্দি হিসেবে পাকিস্তানিদের বলেছি তোমরা আমাকে ফাঁসি দিলেও আমার লাশটা আমার লোকদের কাছে পৌঁছাইয়া দিও। আমাকে কে মারবে বল?
রেণু থমকে দাঁড়ান। দুজনেই ভাবেন আশ্বিনের এক রোদ ভাঙা দুপুরে হাসুর জন্ম হয়েছিল টুঙ্গি পাড়ায়। সব শিউলি ফুলের সৌরভ শিশুটির শরীরে ভরে ছিল। রেহানার জন্ম হয়েছিল ঢাকায়। সেসব একেবারেই তরতাজা স্মৃতি। কীভাবে যেন দিন গড়িয়ে ওরা দুইবোন পায়ে পায়ে বেড়ে উঠল ভাবতেই অবাক লাগছে। এই দুই মেয়ের কথা স্মরণ করে নিজেকে শান্ত করতে পারছেন না কিছুতেই।
রেণু ততক্ষণাৎ নিজেকে প্রবোধ দেন। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে বলেছিলেন, এটাই হয়ত আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের জনগণ, তোমরা যে যেখানেই আছ এবং যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শেষ পর্যন্ত দখলদার সৈন্য বাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য আমি তোমাদের আহŸান জানাচ্ছি। পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলাদেশের মাটি থেকে বিতাড়িত করে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত তোমাদের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে।
রেণু নিজেকে অটল রাখতে পারছেন না। এই নেতাকে কীভাবে রক্ষা করবেন সেই চিন্তায় বুক কাঁপছে তাঁর। হাসু ঠিক এই মানুষটির মতোই হয়েছে। মেয়েটি পিতার মতোই ভাবতে শিখেছে।
ভাষা আন্দোলনের সময় অনশন করে বঙ্গবন্ধুর শরীর খুব দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। স্ট্রেচারে করে জেল থেকে বের করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুকে। পাঁচদিন পর তাঁকে টুঙ্গিপাড়ায় আনার পর হাসু তার পিতার গলা জড়িয়ে ধরে বলেছিল আব্বা রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, রাজবন্দিদের মুক্তি চাই। ২১শে ফেব্রæয়ারির সময় ওরা ঢাকায় ছিল। সেøাগানটি শুনে শুনে পাঁচ বছরের শিশুটির মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল।
ছাত্রজীবনে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল, ও এখন স্বামীর সঙ্গে বিদেশে। একদিন নিশ্চয় জন্মভ‚মিতে ফিরে আসবে একদিন ওরা ফিরে আসবে এই নদীমাতৃক বাংলাদেশে।
বঙ্গবন্ধু বলেছেন মায়েরা আমার আমি চেয়েছিলাম স্বাধীনতা। তোমাদের কাছে আমার এই আশা যে, এ দেশের মানুষ দেশ স্বাধীন করেছে, তোমরা নিরন্ন দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাবে। তোমাদের যেটুকু সাধ্য আছে তাই দিয়ে ওদের জন্য কাজ করবে। রগেণুর দুচোখ বেয়ে অশ্রæ গড়িয়ে পড়ছে।
রাসেল ছেলেটা জন্মেই শুনেছে জয়বাংলা সেøাগান। দোতলা সাদা বাড়িটার সামনে প্রতিদিন, ছেলেটা তার বাবাকে দেখলেই ভাবে নেতা মানেই জয় বাংলা।
লাল সবুজ পতাকা ওড়ায় ছাদে।
একটা সময় সৈন্যদের ভয়ে ওড়াতে পারেনি। এ দেশের মানুষ লড়াই করে পতাকা জিতে নিয়েছে। রাসেল প্রায়ই পতাকা মুড়ে বুক পকেটে রেখে দেয়। রেণুর চোখ ছলছলিয়ে ওঠে। ছেলেটার দিন রাত কাটে পতাকা ওড়ানোর অপেক্ষায়। যখন তখন ছাদে চলে যায়। মানুষের রক্ত মাখা পতাকা একা একাই পতপতিয়ে ওড়ে। এই পতাকার জন্য যুদ্ধ করে কত মানুষ প্রাণ দিয়েছে। কত মাকে হারাতে হয়েছে সম্মান।
রেণু শুনতে পাচ্ছেন বুট জুতার শব্দ। জিপ থেমেছে বাড়ির সামনে। অবিরাম গুলির শব্দ চতুর্দিক থেকে।
বাড়ি ঘেরাও দিলেই ঠিক এমনটি হতে পারে। এসব কিছুই এখন ভাবতে পারছেন না রেণু। রাসেল বাবার কাছে এসে বলল, আব্বা, মা এতো কাঁদছেন কেন?
রাসেল দেখেছে বাবা যখন বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরেছেন তখনও ছিলেন নির্বিকার। হাসু বুবু পতাকা বানিয়ে তার হাতে দিয়েছিল। পতাকাটা তখন বাবার হাতে দিতে পারেনি, বাবা তখন লক্ষ মানুষের ভিড়ে এয়ারপোর্ট থেকেই রেসকোর্স মাঠে চলে গিয়েছিলেন। ওর খুব অভিমান হয়। তার জন্মদাতা জনক এখন তার একার নয়। সাত কোটি জনতার জনক। জাতির জনক। দাদুর সঙ্গে সে বাড়িতে ফিরে আসে। অভিমানে কথা বলে না। অথচ গর্বে তার বুক ভরে যায়। চারদিকে উৎসব আর উৎসব। সেøাগানে মুখরিত। আকাশে রাইফেলের শব্দ। ভয়ের নয় আনন্দের, উচ্ছ¡াসের, সাহস আর স্বাধীনতার পতাকা স্পর্শ করতেও ভালো লাগছিল। গায়ে পতাকা পেঁচিয়ে দিয়ে ঘরে ঘরে ঘুরে বেড়ায়। ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বর বাড়িটি আনন্দে মুখরিত। কান্নাভারাতুর ভয়াবহ পরিবেশ আর নেই। মা-বোনেরা সবাই মুক্ত। বাড়িতে অজস্র লোকের আনাগোনা। তাদের সঙ্গে কথা বলেন জাতির জনক তাদের পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। প্রায়ই তিনি এই ছোট ছেলেটিকে বুকে জড়িয়ে ধরে রাখেন।
রেণু ভাবতে পারছেন না এই ঘরের মধ্যে সবাই জড়ো হয়েছে। উ™£ান্ত সময় গড়াচ্ছে। রেণু ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন। মনে মনে ভাবছেন, এই শিশুর কিছু হবে না। ও তো এই পৃথিবীর নিরাপদ সন্তান। আল্লাহর কাছে তিনি দোয়া চাইছেন। জামাল বিয়ে করেছে একমাসও হয়নি। রোজীর হাতের মেহেদির রং এখনও মুছে যায়নি। ডান হাতের আঙুলে বিয়ের আংটি।                    
সেনা অফিসাররা বাড়িটি ঘিরে রেখেছে। জামাল কামালের কী হবে! এতক্ষণে তিনি তা অনুমান করতে পারছেন। কানের কাছে আছড়ে পড়ছে বুটের শব্দ। ওরা উপরে উঠছে। এই বাড়ির সবাই অনুমান করতে পারছে এই মুহূর্তে মৃত্যুই সত্য। নিচতলায় নীরবে পড়ে থাকা বড় ছেলের লাশ সেটাই জানান দিচ্ছে। ঊনিশ দিন আগে বিবাহিত জীবনের উৎসবের রেশটুকুও এখনও ফুরায়নি।
সৈন্যরা উপরে উঠে এসেছে। রেণু বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠ শুনতে পাচ্ছেন। তোমরা আমাকে ভয় দেখিও না। তোমাদের ভয়ে আমি কাতর নই। তাঁর পরনে চেক লুঙ্গি আর পাঞ্জাবি। রেণু শুনতে পাচ্ছেন, যেদিন আমার বাংলাদেশ ম্বাধীন হয়েছে সে দিনটিই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে সুখের, আনন্দের দিন।
দেশ আর মানুষ ছিল তাঁর পরিবারের চেয়ে প্রিয়। ভাবতে ভাবতেই এক ঝাঁক বুলেট। ঝাঁক ঝাঁক বুলেট স্তব্ধ করে দিচ্ছে একটি পুরো পরিবার, একটি দেশ, একজন জনককে।
কেঁদে ওঠে ঘাস লতাপাতা। আকাশ নদী পদ্মা মেঘনা যমুনা। বিনিময়ে ফোটে নতুন কিছু কৃষ্ণচূড়া।
সময় স্তব্ধ হয়ে পড়েছে এই বাড়িতে। রাত পেরিয়ে নতুন সূর্য উঠেছে লাল আবীর ছড়িয়ে। ঘুমিয়ে পড়েছিল যারা তারা আবার জেগে উঠেছে নতুন করে। দুরন্ত বাধা না-মানা নতুন দিনের বার্তা নিয়ে। ইতিহাসের সাদা পৃষ্ঠা সোনালি অক্ষরে আবৃত হলো এ বাড়ির সবটুকু নিয়েই। ক্ষণিক মুহূর্ত হলো অনন্তকাল।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

শিক্ষাঙ্গন

খেলাধুলা

লাইফস্টাইল

ঘোষনাঃ